‘বৈভবী সম্ভাবী ফাউন্ডেশনের’ আয়োজনে স্বেচ্ছা রক্তদান শিবির

বছর মার্চে যদিও তেমন একটা গরম পড়ে নি। কিন্তু এপ্রিল শুরু হতে না হতেই প্রচন্ড দাবদাহে শহরবাসীর নাজেহাল অবস্থা। ও দিকে আবহাওয়া অফিস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে এ বছর বাংলা নববর্ষ শুরুর আগেই শহরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রী ছাড়িয়ে যাবে। দক্ষিণবঙ্গের অন্য জেলাগুলোতেও চলবে ভয়ঙ্কর তাপ প্রবাহ। এসবের মধ্যেই আবার দিনক্ষণ মেনে নিয়ম মাফিক শুরু হয়ে গিয়েছে চৈত্র সেল। আর তাই নিয়ে প্রতি বছরের মতন এ বছরেও গড়পড়তা বাঙালীর উৎসাহের কোন খামতি নেই। হাতিবাগান, গড়িয়াহাটের মতন রাস্তায় প্রতিদিন সন্ধ্যে নামতে না নামতেই দেখা যাচ্ছে চৈত্র সেলের সেই চেনা ছবি। সাথে এ বছর আবার এ সময়েই নেমেছে রাজাবাজার, ধর্মতলা, চিৎপুরের মতন জায়গায় আসন্ন ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটা করার জন্যে মানুষের ঢল। যদিও এখন ই-কমার্সের দৌলতে অনলাইন কেনাকাটার রমরমার যুগ। তা সত্ত্বেও পথে নেমে নিজের হাতে নেড়েচেড়ে পরখ করে, সম্ভব হলে আরো খানিকটা দরাদরি করে তবেই কেনাকাটা করা মানুষের ভিড় তার আগের দিনের রেকর্ড প্রতিদিনই ভেঙে দিচ্ছে নিয়ম করে। আসন্ন উৎসব নিয়ে মেতে উঠেছে মানুষ। সাথে জুড়েছে খবরের কাগজগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন। সেখানে বেড কভার, দরজা জানালার পর্দা জামাকাপড় ইত্যাদির গন্ডি ছাড়িয়ে চৈত্র সেলে সস্তায় নিজেদের পসরা সাজিয়ে হাজির হয়েছেন শহরের ছোট থেকে বড় ইলেকট্রনিক্স আর গহনার ব্যাপারীরা। এ সময়ে সস্তায় কেনাকাটা করার সুযোগ চেটেপুটে নিতে চান যারা বলাই বাহুল্য তারাই এই শহরের, এই সমাজের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী। অর্থাৎ নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত আর কিছুটা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষজন। এই দুর্মূল্যের বাজারে যাদের প্রতিদিন চলতে হয় খুব হিসেবে করে। টাকাপয়সা খরচ করার জন্যে প্রতিটা পা ফেলতে হয় মেপে। কোন প্রয়োজনে হটাৎ করে বেশ কিছুটা টাকা বের করতে হলে যাদের চিরদিনই কালঘাম ছুটে যায়।কিন্তু এই মরসুমে আসন্ন উৎসবের কথা মাথায় রেখে সকলেই যেন কিছুটা মাতোয়ারা। আর সেটাই স্বাভাবিক। চিরকাল এমনটাই হয়ে এসেছে। মাঝে দু’টো বছর করোনার মারণ আক্রমণের কারণে সে নিয়মের ব্যতিক্রম হলেও গত বছর থেকে আসন্ন গ্রীষ্মের মুখে ফিরে এসেছে সেই চেনা দৃশ্য।

গোটা সমাজ উৎসবের আনন্দে ভেসে গেলেও, চৈত্র সেলের বাজারে ভিড় করলেও, খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনে এয়ার কন্ডিশন মেশিনের সঠিক মডেল বেছে নিতে মশগুল থাকলেও। এই সমাজে এমন কিছু সংগঠন আছে যাদের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছেন নিজের ব্যক্তিগত সুখ স্বচ্ছন্দ স্বার্থকে সহজেই দূরে সরিয়ে রাখতে পারা কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ। যারা এই দেশ, এই সমাজের মানুষের কল্যাণের কথাকে সর্বোপরি মনে করে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন সকলের অলক্ষ্যে। এমনি একটি সংগঠন উত্তর কলকাতার শ্যামবাজার স্ট্রীটের ‘বৈভবী সম্ভাবী ফাউন্ডেশন’ আর তার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা নানা বয়সের, নানা পেশার একদল মানুষ। সমাজের কল্যাণ, রাষ্ট্রের হিত যাদের জীবনের অগ্রাধিকার।
কে না জানে এই গরমের মরশুমে প্রতি বছর শহরের ব্লাড ব্যাঙ্ক গুলোতে রক্তের জন্যে হাহাকার হয়। সেই রক্তের জন্যে – নিজের অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতিতে মানুষকে প্রায় প্রতিদিন চমকে দিলেও যা আজও কৃত্রিম উপায়ে সৃষ্টি করার পদ্ধতি আয়ত্ত করতে পারে নি বিজ্ঞান। তাই মুমূর্ষু রোগীর প্রয়োজনে রক্তের যোগান দিতে আজও একজন মানুষের একমাত্র ভরসা অন্যজন মানুষ। আর বিপদের দিনে সেটার প্রয়োজন সব থেকে বেশী যাদের তারা সেই নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত আর কিছুটা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। উৎসবের প্রাক্কালে যারা আনন্দে আবেগে মাতোয়ারা। সেই বৃহত্তর সমাজের কথা চিন্তা করেই এপ্রিলের ৯ তারিখ, রবিবার বিকেলে উত্তর কলকাতার শ্যামপার্কের ঠিক পাশেই ১৭ নং শ্যামপার্ক লেনের সিদ্ধেশ্বরী হাউসে ‘বৈভবী সম্ভাবী ফাউন্ডেশন’ আয়োজন করেছিল স্বেচ্ছায় রক্তদান করার জন্যে এক শিবিরের।

এই উদ্যোগের নাম তারা দিয়েছিলেন ‘রক্তকরবী’। কবিগুরুর বিখ্যাত সৃষ্টি রক্তকরবীকেই অবলম্বন করে তার প্রতিবাদের কাহিনীকে উপজীব্য করে এগিয়ে চলার জন্যেই তাদের এই উদ্যোগের এমন নামকরণ বলে জানালেন ফাউন্ডেশনের এক নবীন সদস্য। লাইফ কেয়ার ব্লাড ব্যাঙ্কের সাথে যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা এই শিবিরে রবিবার সন্ধ্যায় স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছেন মোট 47 জন মানুষ। যাদের মধ্যে মহিলা 16 জন।

সংস্থার সদর দপ্তর যদিও শহর কলকাতাতে। সেখান থেকেই মাত্র কয়েক বছর আগে তাদের পথ চলার শুরু। এখন সংস্থার শাখা কেন্দ্র রয়েছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের ছোট বড় বেশ কয়েকটি শহরে আর গ্রামাঞ্চলে। সেখানকার সদস্যরাও দেশ হিতে, সমাজ কল্যানে একই রকম ভাবে সক্রিয়। গোটা দেশের মতন এই কলকাতাতেও সংস্থার উদ্যোগে সারা বছর ধরে চলে বিনা বা নামমাত্র অর্থমূল্যের বিনিময়ে সংস্কৃত শিক্ষা, কারিগরী শিক্ষা, দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের স্কুল শিক্ষার সহায়ক শিক্ষা দেওয়ার মতন নানা রকম কার্যক্রম। পাশাপাশি ধারাবাহিক ভাবে চলে মেয়েদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ। সাথে নিরবিচ্ছিন্নভাবে পরিবেশ সচেতনতার প্রসারে প্রচার, পরিবেশ রক্ষা আর আর্তের, দুঃস্থের সেবা করার কাজ তো আছেই।
সংস্থার কলকাতা কেন্দ্রের এক প্রবীণ সদস্যা জানালেন কোভিডের সময়ে যখন চতুর্দিকে সব কিছু বন্ধ। মানুষের দিন কাটছে আতঙ্কে। তখনও নিজেদের জীবনের ঝুঁকির তোয়াক্কা না করে কখনো টানা খাবারের যোগান দিয়ে, কখনো আবার ওষুধ আর পথ্যের ব্যবস্থা করে এলাকার দুঃস্থ অসহায় মানুষের পাশে ছিলেন তাদের কেন্দ্রের সদস্যরা। পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে গঙ্গা নদী। মহালয়া সহ বিভিন্ন বিশেষ দিনে যখন গঙ্গার ঘাট গুলোতে অজস্র মানুষের আনাগোনা হয় সেদিন গুলোতে সেখানে উপস্থিত থাকেন তাদের সদস্যরা। মানুষের মধ্যে গঙ্গা নদী আর তার তীরবর্তী এলাকাগুলো পরিছন্ন রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা প্রচার করেন তারা। দিনের শেষে সকলে ঘরে ফিরে যাওয়ার পরে গঙ্গার তীরে সেদিন আগত মানুষের ফেলে যাওয়া আবর্জনা পরিষ্কার করে তবেই তারা ঘরে ফেরেন। আবার উৎসবের দিনগুলোতে সুদূর সুন্দরবন অঞ্চলের বেশ কয়েকটি প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছে গিয়েছিলেন এরা। সেখানকার দুঃস্থ মানুষের হাতে নতুন পোশাক তুলে দিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছিলেন বলেই তাদেরও উৎসব সার্থক হয়েছে। এমনটাই মনে করেন সংস্থার আরেক কিশোর সদস্য। এদের সকলের একান্ত ইচ্ছা আগামী দিনগুলোতে সকলের শুভেচ্ছা আর সহযোগিতা সাথে নিয়ে সমাজ কল্যানে, রাষ্ট্র হিতে তারা যেন আরো বেশি করে নিজেদের সঁপে দিতে পারে।
📸 রাজিব মুখোপাধ্যায়