মাতৃ রূপের কারিগর মালা পাল
কলকাতার প্রাণকেন্দ্র উত্তর কলকাতা। আর এই উত্তর কলকাতার শোভাবাজারের উত্তর দিকের সরু গলির ভেতর দিয়ে হাঁটলেই যে জায়গায় পৌঁছানো যায়, তার নাম কুমোরটুলি, যা এই শহর কলকাতার কাছে অতি পরিচিত, মাটির প্রতিমা গড়ার বিখ্যাত গ্রাম হিসেবে। মাতৃ পুজো একেবারে দোরগোড়ায় । কুমোরটুলি জুড়ে তুমুল ব্যস্ততা এখন। এযেন বাঁশ, খড় আর মাটি মিশে যেন এক জীবন্ত শিল্পশালা। দুর্গাপূজা, সরস্বতী পুজো, কালীপুজো — সব বড় উৎসবের প্রতিমা এখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ে সারা শহর, সারা দেশ, এমনকি বিদেশেও।
আজ থেকে অনেক বছর আগে কুমোরটুলির পুরুষতান্ত্রিক জীবিকার বেড়া ভেঙেছিলেন যে কজন মানবী, তাদের মধ্যে অন্যতম তিনি । আজ তিনি দেশের বাইরেও পরিচিত নিজের শিল্প পরিচয়ে।মাতৃশক্তির এই আগমনী আবহেই আজ আমরা আমাদের পত্রিকার তরফ থেকে কথা বললাম অভিজ্ঞ মৃৎশিল্পী, ৫৬ বছর বয়সী মালা পালের সঙ্গে। যিনি কুমোরটুলির একজন প্রতিভা ময়ী মহিলা শিল্পী হিসেবে খ্যাত। আলাপচারিতায় তার কাছে থেকে কুমোরটুলির বেশ কিছু অজানা তথ্য জানতে পারি যা আমরা পাঠকের সুবিধার্থে প্রশ্ন উত্তর সহযোগের বর্ণনার চেষ্টা করা হয়েছে —
তার কাছে আমাদের প্রথম প্রশ্ন ছিল :: 
পত্রিকা : মহিলা শিল্পী হিসেবে কুমোরটুলিতে আপনার হাতেখড়ির ইতিহাসটা একটু জানান?
শিল্পী : আমার শুরুটা হয়েছিলো মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকে, যখন এই শিল্পের সঙ্গে আমার পরিচয়। সালটা ছিলো ১৯৮৫ , তখন আমার বাবা মারা যায় এবং আমি গিয়ে পৌঁছায় দিল্লীতে। সেখানে আমি ৬ মাস ধরে ভালো করে কাজ শিখে কুমারী মালা পাল থেকে শিল্পী মালা পাল রূপে ফিরে আসি এখানে। তারপর থেকেই শুরু হয় আমার এই আজকের মালা পাল হয়ে উৎসার যাত্রা ।
পত্রিকা : আপনাদের এখানে প্রতিমা তৈরির কাজটা কখন এবং কিভাবে ঠিক শুরু হয়?
শিল্পী : মূলত এখানে প্রতিমা তৈরির কাজটা বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস অর্থাৎ বৈশাখ মাস থেকেই শুরু হয়ে যায়, আমাদের সাধারণত পয়লা বৈশাখ থেকেই বিভিন্ন অর্ডার আসতে শুরু করে, তবে মোটামুটিভাবে বৈশাখ মাস থেকে একেবারে ঝুলন পেরিয়ে জন্মাষ্টমী যাওয়া পর্যন্ত বোঝা যায় যে, ঠিক কতগুলো প্রতিমার অর্ডার আসলো। এছাড়া গঠনগত দিক বলতে, প্রথমে কাঠামো বাঁধা হয়, তারপর গঠন হয় খড় দিয়ে। খড় বাঁধার পরে খড়টাকে ভালো করে মুছে নিয়ে তার ওপরে তিন চার রকমের মাটি প্রতিমার একটা অংশ গঠন করে তারপর প্রতিমার মূল মুখের সঙ্গে জোড়া দিয়ে দেওয়া হয় এবং তারপর রং ও আনুষঙ্গিক কাজ।
পত্রিকা : এক একটা দুর্গা প্রতিমা বানাতে কত সময় লাগে?
মালা পাল : সরল হাসি নিয়ে শিল্পী জানালেন মোটামুটিভাবে ধরে নিন বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাস থেকে আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত, প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ মাস।
পত্রিকা :: প্রান্তিক বয়সেও তরুণদের মতো পরিশ্রম করেন আপনি। তা আপনি সৃজনের এই প্রেরণা কোথা থেকে পান?
শিল্পী : আমার এই প্রিয় শিল্প তথা কর্মজীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আমার সহকর্মীদের সহায়তা, পুজো উদ্যোক্তাদের ফিডব্যাক এবং আপামর দর্শনার্থীদের ভালোবাসাই হলো, আমার অনুপ্রেরণার প্রধান উৎস । পাশাপাশি, আমি কুমোরটুলিতে একটি ছোট্ট শিল্পের পাঠাশালা চালাই, যা আমাকে কিছু পুরষ্কার এনে দিয়েছে। এহেন ছোট ছোট অ্যাচিভমেন্ট গুলোও আমার অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস । কুমোরটুলির মালা পাল আপনাদের সকলেরই মালা পাল।
পত্রিকা : মহিলা শিল্পী হিসেবে কর্মজীবনের শুরুতে বা তার পরবর্তীতে কি কখনো কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো?
শিল্পী : অবশ্যই, ছোটোবেলায় বাবা যখন জীবিত ছিলেন, তখন বাবার কাছে আমি প্রশ্ন করেছিলাম যে বাবা, আমি কি মৃৎশিল্পী হতে পারি ?? উত্তরে বাবা বলেছিলেন যে, “মেয়ে হিসেবে মৃৎশিল্পী হওয়াটা কঠিন।” যা পরবর্তীকালে আমি দিল্লী থেকে কুমোরটুলিতে এসে বুঝতে পারি, কারণ প্রথম প্রথম এখানকার সকলেই বলেছিলেন যে , মেয়েরা নাকি এই কাজ করে না। এমনকি বহুবার আমাকে প্রতিমা তৈরিতেও বাঁধা দেওয়া হয়েছিলো। তো যাই হোক, চ্যালেঞ্জেস তখনও ছিলো এখনও আছে, কিন্তু অন্য রূপে। তবুও শত বাঁধা-বিপত্তি পেরিয়েই এগোনোর নাম জীবন।
পত্রিকা : আমাদের পরবর্তী প্রশ্ন হলো, এই বর্ষাকাল কুমোরটুলির নিশ্চয়ই একটা বড় সমস্যা? তা এই বৃষ্টির মরশুমটাকে আপনারা কিভাবে প্রতিমা তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়ে যান?
শিল্পী :: একদম ঠিক বলেছেন । প্রতিমা গড়াকালীন এই বর্ষাকালটাই হলো, আমাদের কাছে সবথেকে প্রতিবন্ধকতার সময়। দেখুন , যখন অর্ডার নিয়েছি তখন সময়মতো তো কাজ শেষ করতেই হবে। প্রকৃতিকে তো আর আটকানো যাবে না, আর আটকানোও ঠিক নয়। আর সমস্যা বলতে গেলে, মূল সমস্যা হলো কুমোরটুলিতে জল জমা !
পত্রিকা : ঠিক কেন? নিকাশি ব্যবস্থা নিয়ে কোনো সমস্যা আছে ?
শিল্পী :: হ্যা, একবার এক পশলা বৃষ্টি হলেই কুমোরটুলিতে এক হাঁটু জল জমে যায়। পাশাপাশি, আমাদের ঠাকুর শুকোতে খুব সমস্যা হয়। শেষে বাধ্য হই, আগুনের সাহায্য নিতে।
পত্রিকা :: তা, এই সময় সরকার থেকে কোনোরকম সাহায্য…? অথবা ক্ষতি হলে কোনোরকম কোনো আর্থিক সাহায্য কি আপনারা পান না ?
শিল্পী মালা পাল :: সরকার… ওই শুধুমাত্র একটা ত্রিপল দিয়েই ছেড়ে দেয়। আর আর্থিক সাহায্য বলতে, অনেক লড়াই করে যৎসামান্য ক্ষতিপূরণ পাই। বাকিটা আমাদেরকেই সামলাতে হয়। কারণ আমাদের সেইভাবে কোনোরকম কোনো ইন্সুরেন্স থাকে না।
পত্রিকা :: আচ্ছা এই প্রসঙ্গেই আমার প্রশ্ন, কুমোরটুলি আপনার শিল্পের ধাত্রীভূমি। বর্তমানে থিম শিল্পীদের রমরমায় কি অন্য রাজনীতি শুরু হয়েছে এখানে?
শিল্পী :: না, সেভাবে সরাসরি রাজনীতির প্রভাব এখানে নেই বললেই চলে কিন্তু, আজও আমাদের লড়াই করে আমাদের দাবী ছিনিয়ে নিতে হয়।
পত্রিকা :: সাবেকি ঠাকুরের পাশাপাশি থিম পুজো প্রতিমা তৈরি হয় কুমোরটুলতে। কোন ঘরানা আপনার পছন্দের?
শিল্পী মালা পাল :: আমি সাধারণত সাবেকি প্রতিমা গড়তেই ভালোবাসি এবং আমার সাধারণত এই সনাতনী ঘরনার রূপটাই পছন্দ। কিন্তু থিম টা যারা করে, তাদের সেটা হাতের কাজ, তারাও কিন্তু কাজটা নিখুঁতভাবে করে। ভুলে গেলে চলবে না সেটাও কিন্তু একটা আর্ট । এবার আর্ট টা হচ্ছে শুধুমাত্র দেখার ক্ষেত্রে, কারণ তার তো আর পুজো হয় না। কিন্তু একচালা প্রতিমাই হোক বা আলাদা আলাদা, সাবেকি কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য । তবে আজকের দিনে দাঁড়ায়ে থিমটাও কিন্তু সমভাবে প্রয়োজন।
পত্রিকা :: তাহলে আপনি কি মনে করছেন, আগামী ১০ বছরে সাবকিয়ানা এবং থিম , এই দুইয়ের মধ্যে কি প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হবে?
মালা পাল : মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, সাবেকিয়ানা এবং থিম যে যার নিজের জায়গায় আছে এবং আমি মনে করি, সাবেকিয়ানা তার জাগয়াগ থাক এবং থিম তার জায়গায় থাক।
পত্রিকা : দিদি, ফাইবার, প্লাস্টার বা থার্মোকলের মতো নতুন উপকরণের ব্যবহার ঐতিহ্যবাহী মাটির প্রতিমা শিল্পকে কতটা হুমকির মুখে ফেলছে? উৎসব কমিটি বা ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন থাকে এবং প্রতিমা তৈরির সময় স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশসংক্রান্ত কী কী সমস্যার সম্মুখীন হন?
শিল্পী :: একদমই নয়। আমরা ক্রেতাদেরই চাহিদাকে মাথায় রেখে ফাইবার বা থার্মোকল ব্যবহার করি। আর দেখুন প্রতিমা মাটির ছিলো, মাটির থাকবে । কিন্তু তাতে ফাইবার বা থার্মোকলের ব্যবহার রূপসজ্জা মাত্র। এতে কোনো সমস্যা নেই। তাছাড়া পরিবেশের কথা মাথায় রেখেই তা আমরা ব্যবহার করে থাকি।
পত্রিকা : সাম্প্রতিককালে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের তরফে জানানো হয়েছে যে, “এই বছর থেকে প্লাষ্টিক আর থার্মোকল ঠাকুরের অঙ্গ সজ্জায় ব্যবহার করা যাবে না।” শেষ মুহূর্তে এর প্রভাব কতটা?
মালা পাল –> আমি আবারও বলছি, ক্রেতাদের চাহিদাতেই এবং পরিবেশের কথা মাথায় রেখেই আমরা ফাইবার বা থার্মোকল ব্যবহার করে থাকি। তবে হ্যাঁ এবছর থানা থেকে আমাদের বারণ করা হয়েছিলো, কিন্তু পরবর্তীতে আমরা থানা ঘেরাও করে চালিয়ে নিয়েছি। কারণ থার্মোকল ছাড়া ঠাকুরের সাজ হবে না, দুর্গাপুজোও হবে না, এখনও পর্যন্ত চলছে জানি না পরের বছর কি হবে…
পত্রিকা : গোটা দুর্গাপুজোটাই এখন একটা আর্ট গ্যালারিতে পরিণত হয়েছে। ভক্তি কি ফিকে হচ্ছে?
শিল্পী :: না সেরকম নয়। আর্ট হলো নিজেই একটা শিল্প, তবে হ্যাঁ এটা বলা যেতে পারে আর্টের কাছে আজ ভক্তিটা কোথাও যেন ফিকে দেখাচ্ছে। যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আজকের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দিয়ে।
পত্রিকা :: তাহলে কি নতুন প্রজন্ম আর এই শিল্পে আসতে চাইছে না?
মালা পাল : না, এটা ভুল কথা। আসছে এবং বহু তরুণ-তরুণী, তারা এই শিল্পটাকে ভালোবেসে নিজের করে নিতে চাইছে।
পত্রিকা :: তরুণ প্রজন্ম কি এই শিল্পে আগ্রহ দেখাচ্ছে, নাকি অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে? এবং আমি শুনেছি যে,আপনি পরবর্তী প্রজন্মকেও নিজ হস্তে প্রতিমা গড়া শিখিয়ে দেন, তা আপনার মধ্যে এই ভাবনাটা কিভাবে এসেছিলো?
শিল্পী :: (মুখে চওড়া হাসি) না না সেরকমটা নয়। এটা আমার একটা ক্ষুদ্র প্রয়াসমাত্র। পাঠাশালা খোলার ভাবনা আসে সর্বপ্রথম তরুণ প্রজন্মের উৎসাহ দেখে। তারপর প্রায় একদশক কেটে গেছে। এনে দিয়েছে বহু পুরস্কার । আর এখানে একেবারে শুরু থেকেই ধরে ধরেই হাতে করে কাজ শেখানো হয়। এখনও পর্যন্ত যারা কাজটা শিখছে, জানি না ভবিষ্যতে তারা কাজটা ধরে রাখতে পারবে কি না…
পত্রিকা :: মালা দি, আমরা প্রায় প্রতিবছরই দেখি যে, পুজো শুরু ঠিক ২-৩ মাস আগে থেকে বহু তরুণ তরুণীরা কুমোরটুলিতে এসে ভীড় করে, বিভিন্ন কারণে । তা ফটো তোলাই হোক অথবা বা ভিডিওগ্রাফি, এতে করে আপনাদের অসুবিধা হয় না?
শিল্পী মালা পালের অকপট উত্তর হ্যাঁ, কাজ করতে তো সমস্যা হয়। কিন্তু কি আর করবো, আমরা তো তাদের আটকাটে পারি না, তাই দোকানটুকু দড়ির মাধ্যমে আমাদের ঘিরে রাখতে হয়। তারা তাদের কাজ করুক এবং আমরা আমাদের কাজ। কেউ কাউকে ডিসটার্ব না করলেই হলো। কিন্তু বাস্তবে আমাদের সমস্যা হয়, মাল নিয়ে আসা নিয়ে যাওয়াতে প্রচন্ড সমস্যা হয়। এখন ভবিষ্যতে কি হবে তা ভবিষ্যৎ বলবে…
পত্রিকা : ভিনরাজ্য এবং বিদেশেও প্রতিমা পাঠান শুনেছি?
শিল্পী :: হ্যাঁ, আমাদের কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা দিল্লী, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায় এবং এবছরও গেছে তাছাড়া লন্ডন, অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশেও আমরা প্রতিমা পাঠিয়ে থাকি।
পত্রিকা :: বিগত বছরগুলোর ন্যায় এইবছরে কুমোরটুলিতে ঠিক কি পরিবর্তন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
শিল্পী :: না, কিছুই পরিবর্তন হয়নি। একই আছে।
পত্রিকা :: আচ্ছা, আপনার জীবনের এতগুলো বছর আপনি কুমোরটুলিতে শিল্পী হিসেবে রয়েছে,তা এখনও পর্যন্ত কুমোরটুলিকে নিয়ে আপনার স্মরণীয় ঘটনা ঠিক কোনটা?
শিল্পী মালা পাল : কুমোরটুলি আমার দেবদেবীর মন্দির। কুমোরটুলিকে আমি ভালোবাসি, মৃৎশিল্প কে আমি ভালোবাসি এবং স্মরণীয় ঘটনা বলতে, জীবনে প্রথম বার যখন কুমোরটুলিতে আসি, তখন সেই প্রথম দিনে মায়ের প্রতিমার ওপর নিজ হস্তে দেওয়া মাটির প্রলেপ আমার জীবনে স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।
পত্রিকা : প্রতিবারই পুজোর সময় কাজের বিরাট চাপ থাকে। কীভাবে নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখেন?
শিল্পী :: দেখুন, বায়না যখন নিয়েছি তখন সময়মতো তো ডেলিভারি করতেই হবে। ফলত প্রত্যাশার চাপ মাথায় রেখে উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণাকে পাথেয় করেই এগিয়ে যাই।
পত্রিকা :: কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির ফলে কী প্রভাব পড়ছে এবং এই পরিস্থিতিতে কি সরকারি সাহায্য, ঋণ বা ভর্তুকি পান? এছাড়া মূলত ছোট প্রতিমাগুলো অনলাইন বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কি বিক্রির সুযোগ রয়েছে এবং বিক্রি থেকে প্রাপ্ত আয় কি শ্রম ও খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, নাকি মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ন্যায্য দাম পান না? এছাড়া সারাটা বছর কিভাবে আপনাদের সংসার চলে?
শিল্পী :: দেখুন প্রথমত, লক ডাউন এর পর থেকেই কাঁচামালের দাম একটু একটু করে বাড়তে শুরু করে। তবে এখনও পর্যন্ত হাতের বাইরে যায়নি। কিন্তু হ্যাঁ, আগের থেকে অনেকটাই কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, সরকার থেকে আমরা কোনো রকম কোনো ভর্তুকিই পাই না। আর মূলত ছোটো প্রতিমা বলতে আমাদের এখানে আপনি ২.৫” থেকে শুরু করে একচালা প্রতিমা পর্যন্ত সবটাই পেয়ে যাবেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমরা কেউই অনলাইন -এ বিক্রি করি না এবং সেরকম কোনো সিস্টেম -ও নেই। আর হ্যাঁ, লক ডাউন -এর পর জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় আমাদের আয় ব্যায়ের সমীকরণটা বদলেছে। সেভাবে দালাল না থাকলেও প্রতিমা পিছু আয়টা অনেকটাই কমেছে। এবং তৃতীয়ত, বছরভর কুমোরটুলি প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত থাকে। ফলত, সারটা বছর কাজ করার ফলে আমাদের সেইভাবে কোনোরকম কোনো সমস্যা হয় না।
পত্রিকা :: কুমোরটুলির বহু উত্থানপতনের সাক্ষী আপনি। ভবিষ্যতে কুমোরটুলিকে কীভাবে দেখতে চাইবেন? অর্থাৎ আপনার স্বপ্ন কী?
শিল্পী : স্বপ্ন বলতে বিশেষ কিছু নয়, কুমোরটুলিকে আমি আপন করে নিয়েছি। কুমোরটুলি তার নিজের জায়গায় থাক। এই স্থান পবিত্র স্থান। কুমোরটুলিকে আমি ভবিষ্যতে দেবদেবীর মন্দিরের ন্যায় দেখতে চাই।
পত্রিকা :: শেষ প্রশ্ন , শিল্পী মালা পাল হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মেকে আপনি ঠিক কি বার্তা দিতে চাইবেন?
শিল্পী মালা পাল :: তাদের একটাই কথা বলবো, তোমরা আসো, এসে নতুন করে পেশাটাকে ভালোবেসে নিজের করে নাও। তোমাদের থেকে যদি নতুন নতুন আইডিয়া আসে, তাহলে আমি বিশ্বাসী, সেই আইডিয়া এই শিল্পটাকে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দেবে এবং আমি মৃৎশিল্পী মালা পাল হিসেবে যেন আরও মালা পাল প্রতিটি ঘরে ঘরে তৈরি করতে পারি এইটুকুই আমার কামনা।
কলকাতা কুমোরটুলির মহিলা মৃৎশিল্পী মালা পালের সঙ্গে আমাদের এই স্বল্প আলাপচারিতায় কথোপকথন আমরা তুলে ধরতে চেয়েছি আমাদের পাঠকদের জন্য। জানার চেষ্টা করেছি বিখ্যাত কুমোটুলির ইতিহাস সম্পর্কে। আমাদের পত্রিকার পক্ষ থেকে শিল্পী মালা পালের দীর্ঘায়ু কামনার সাথে সাথে প্রার্থনা করি ঠিক এইভাবেই আপনি আপনার শিল্পকলাকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে যেন আগামীদিনেও এক একজন মালা পাল জন্ম নেয় এবং ঠিক এইরকমভাবেই যেন বাঙালির শিল্পকলা চির অমর হয়ে থাকে পৃথিবীর দরবারে। আপনাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল আমাদের পত্রিকার পক্ষ থেকে।
পত্রিকার তরফে শিল্পীর সঙ্গে আলাপচারিতায় শ্রীজিতা দাস