১৯২১ সালে কলকাতার বুকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল নির্মাণ কাহিনীর সহিত ব্রিটিশ সম্পর্ক
বেবি চক্রবর্তী :::: পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত রানীদের মধ্যে একজন ছিলেন রানি ভিক্টোরিয়া। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তাঁর মাথায় উঠেছিল “রাজ মুকুট”। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহে’র ফলে ভারতীয়দের পাশাপাশি অনেক ইউরোপিয়ান বণিক মারা যান। তখন ব্রিটিশ সরকার এই ঘটনায় অত্যন্ত আক্ষেপ প্রকাশ করে ভারতের নিয়ন্ত্রণ ” ইস্ট্ ইন্ডিয়া কোম্পানি’র ” কাছ থেকে সরাসরি নিয়ে নেয়। ১৮৭৬ সালে “রয়্যাল্ টাইটেল্ অ্যাক্ট” পাশের মাধ্যমে বিট্রিশ পার্লামেন্টে রানী ভিক্টোরিয়া’কে “ভারত সাম্রাগ্রী” উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং এখানে উল্ল্যেখিত হয় ” ইস্ট্ ইন্ডিয়া কোম্পানি ” কে তাঁদের লভ্যাংশের শুক্ল দিতে হবে ব্রিটিশ সরকারকে আবার অন্যদিকে বলা হয় যে শুধুমাত্র বানিজ্য করলে হবেনা ভারতের উন্নতি সাধন করতে হবে। শুধুমাত্র ভারতবর্ষ নয় তখন ইংল্যান্ডেও উপনিবেশিক্ আগ্রাসী শাসন চলেছিল অ্যায়ারল্যান্ড সহ বেশকিছু ইংল্যান্ডের ছোট্ ছোট্ অংশে এছাড়াও নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া,কানাডা এবং আফ্রিকা মহাদেশের একটা বিশাল অংশেও এই আগ্রাসী উপনিবেশিক্ শাসনের বিরুদ্ধে এই সব অংশগুলি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।এই বিশাল অংশের শাসনভার রানী ভিক্টোরিয়া’র ওপর থাকায় তিনি হয়েছিলেন রানী থেকে মহারানী।আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশেও রানী ভিক্টোরিয়া হয়েছিল ব্যাপক্ জনপ্রিয়ত ভিক্টোরিয়া প্যালেস্, ভিক্টোরিয়া কলেজ, ভিক্টোরিয়া পার্ক সহ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল্।রানী নিজেও উপনিবেশিক্ ভারতকে খুব ভালোবাসতেন।কলকাতার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটক স্থান ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ।

এর পিছনের ইতিহাসটা’ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্রিটিশ শক্তির স্থায়িত্বের এক অন্যতম প্রতীক। ১৯০১ সালের ২২ শে জানুয়ারি রানীর মৃত্যু হলে সেই খবর তখন কলকাতাবাসী ইংরেজ গোষ্ঠীকে বিশাল ভাবে আঘাত করে,ব্রিটিশ ভারতে তখন বড়লাট ছিলেন লর্ড কার্জন। তিনি ১৯০১ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি কলকাতা টাউন হলে এক স্মরণসভার আয়োজন করেন। ইতিহাস সচেতন কার্জন সাহেব সেই সভাতে রানির স্মৃতিতে একটি বিশাল স্মৃতি সৌধ তৈরির পরিকল্পনা প্রস্তাব পেশ করেন, এই প্রস্তাব ছাড়াও আরও কিছু পরামর্শ সেই সভায় রাখা হয়েছিল। কেউ কেউ সুপারিশ করেছিলেন যে শিয়ালদহ স্টেশনের চারপাশে খালি জায়গাতে এই সৌধ তৈরি হোক আবার কেউ কেউ চেয়েছিলেন যে স্মৃতি সৌধটিতে ভারতীয় পুরাণ, নথিপত্র এবং ভারতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক জিনিস থাকবে। কিন্তু কার্জন সাহেবের মাথায় অন্য কিছু ছিল,যেহেতু কলকাতা তৎকালীন ভারতের রাজধানী ছিল, তাই তিনি চেয়েছিলেন ব্রিটিশদের নির্মিত কোনও স্থাপত্য এই শহরে থাকুক। প্রাথমিক ভাবে ঠিক হয়েছিল স্থাপত্যটি নির্মিত হবে রানি ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিতে এবং অন্যদিকে এটি একটি সংগ্রহালয়েরও কাজ করবে। মূলত কার্জন সাহেবের উদ্দ্যোগেই এই স্থাপত্যটি তৈরির জন্যে কলকাতার ময়দান সংলগ্ন অঞ্চলের ৬৪ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু এত স্মৃতি সৌধ নিমার্ণের জন্য যেমন অনেক টাকার প্রয়োজন ছিল,সেই সঙ্গে প্রয়োজন ছিল অতি দক্ষ প্রযুক্তি বিদেরও, প্রায় ১ কোটি ৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল এই ভবন নির্মাণের জন্যে। এই বিশাল পরিমাণ অর্থের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে সাহায্যও নেওয়া হয়েছিল। অবশ্য প্রত্যেকে এই আবেদনে সাড়া দিয়েছিলেন এবং অর্থ সংগ্রহ করতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি। ব্রিটিশ ইনস্টিটিউট অফ্ আর্কিটেক্ট- এর প্রেসিডেন্ট্ স্যার উইলিয়াম এমারসন এই ভবনের পরিকল্পনা ও নকসা প্রস্তুত করেন। বিস্তৃত উদ্যানগুলি ডিজাইন করেছিলেন লর্ড রেডসডেল এবং ডেভিড প্যারেন্। তবে আর্কিটেক্ট হিসেবে এর নির্মাণ কাজ তত্ত্বাবধান করেন বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট ইজ্ঞিনিয়ার ভিনসেন্ট জেইস্চ( Vincent J Each), তিনি ভবনের বাগানের গেটগুলি নকশা করেন।

১৯০২ সালে এমারসন তাঁকে ভবনটির মূল নকশা এঁকে ফেলার দায়িত্ব দেন। প্রায় ১০৩ মিটার লম্বা, ৬৯ মিটার চওড়া এবং ৫৬ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট এই স্থাপত্যটি তৈরির ভার পরে কলকাতার মেসার্স মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি। যেহেতু কার্জন সাহেবের কাছে তাজমহল অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল। সেই কারণে তিনি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল নির্মাণের ক্ষেত্রে কোন খুঁত রাখতে চাননি তাই তাজমহলে যে সাদা মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ভবন নির্মাণেও সেই পাথর ব্যবহার করা হয়।১৯০৫ সালে কার্জন যখন ভারত ছেড়ে যান তখন এই নির্মাণ কাজ ঠিকমতো শুরুই হতে পারেনি । কার্জন পরবর্তী ভাইসরয় এই ভবন নির্মাণের ব্যাপারে ততটা উৎসাহ দেখায় নি, তাই ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা- নিরিক্ষাতেও অনেক দেরি হয়ে যায়।ভবনটির সাব্ স্ট্রাকচার এর কাজ শুরু হয় ১৯০৪ সালে, ১৯০৬ সালে ওয়েলসের রাজা পঞ্চম জর্জ এই ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, আর ভবনের সুপার স্ট্রাকচার এর কাজ শুরু হয় ১৯০৪ সালে, ১৯০৬ সালে ওয়েলসের রাজা পঞ্চম জর্জ এই ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন আর চার বছর পর মানে ১৯১০ সালে। এরপর কেটে যায় প্রায় ১১ বছর । ১৯২১ সালের ২৮ শে ডিসেম্বর এই ভবনটি উদ্বোধন করেন রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড। ব্রিটিশ রাজপরিবার ১২০০ বছরের গৌরব খ্যাতিনাম হিসাবে যোগ আছে রানী ভিক্টোরিয়া’র।ইংল্যান্ডের রাজতন্ত্রের টালমাটাল দশায় ধরেছিলেন শক্ত রাশ ফিরিয়ে এনেছিলেন রাজতন্ত্রের গরিমা।একেরপর এক আধুনিক সংস্কার জনকল্যাণ মূলক কাজকর্ম তিনি দেশের মানুষের কাছে হয়েছিলেন নয়নের মুনি। এরপর তিনি সাধারণ রাণী থেকে হয়ে উঠেছিলেন মহারানী ভিক্টোরিয়া। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৮২০ সালে’র ২৪ শে মে লন্ডনের ক্যানসিংটন রাজপ্রাসাদে।তাঁর প্রকৃতনাম ছিল আলেকজান্ডারইয়া ভিক্টোরিয়া। ডিউক্ এড্ ক্যান্ অ্যাডওয়ারে’র একমাত্র সন্তান, রাজা তৃতীয় জর্জের চতুর্থ পুত্র। ১৮২০ সালে রানী ভিক্টোরিয়া’র বয়স একবছরও পূর্ণ হয়নি তখন তাঁর বাবা এড্ ক্যান্ অ্যাডাওয়ার মারা যান। তাঁর মায়ের নাম প্রিন্সেস্ ভিক্টোরিয়া অফ্ স্যাককেভার্ সালফ্রেড্।তিনি ছিলেন একজন জার্মান ডিউক্ এর কন্যা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করতে হয়নি। তাঁর মা’ই তাঁর পড়াশুনোর দায়িত্ব পালন করতেন। রাজ পরিবারের মেয়ে পাছে সাধারণ পরিবারের আর পাঁচ’টা ছেলেমেয়েদের সাথে না মেশে তাঁর জন্য তাকে স্কুলে পাঠানো হয়নি। সমবয়সী কারুর সাথে মেলামেশার সুযোগ পায়নি তিনি।পরে জার্মান গৃহশিক্ষক রাখা হয়েছিল ছোটো ভিক্টোরিয়া’র জন্য। খুব অল্প বয়সে জার্মান এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। শৈশব থেকে কৈশোরে রানী ভিক্টোরিয়া’কে কখনই একা থাকতে হয়নি। রাজকর্মচারী সেবিকা লেগেই থাকত এই অতিরিক্ত তদারকি মোটেই তাঁর ভালো লাগত না বিরক্ত লাগত। কিন্তু তাঁর পক্ষে ওই সময় কিছু করার ছিলনা। রাজপ্রাসাদের কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা আর মায়ের কড়া শাসন এব্যাপারে রাজ কর্মকর্তা জন্ কনডয়ও কম যেত না। ভিক্টোরিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতেন তিনিও। একদিকে নিয়মকানুন সহবত শিক্ষা অন্যদিকে এই দুইজনের প্রতিমুহূর্তে নজরদারি ভিক্টোরিয়া’র শৈশবকে দুর্বিসহ করে তুলেছিল।প্রাসাদের এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি ছিলনা। মনখারাপ হলে প্রাসাদের এক কোণে ছোটো মেয়েটি একাই বসে গেলা করত পোষ্য কুকুর আর ডল্ পুতুলদের সাথে এইভাবে ক্যাসিংটন্ প্রাসাদে বেড়ে ওঠেন তিনি। ১৮৩৭ সালে রাজা চতুর্থ উইলিয়াম মারা যান। এরপর তাঁকে মনোনীত করা হয় এরপর পাঁচ ঘন্টা ধরে চলে অভিষেক ওয়েস্ট্ মিনিস্টার্ আমেজে সেখানে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী সহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিরা দেখা করতে আসেন,উৎসাহিত জনতা ” রানী দীর্ঘজীবি হোক্ বলে শ্লোগান তোলেন।মাত্র ১৮ বছর বয়সে রানী’র মাথায় মুকুট দেওয়া হয়। সিংহাসন লাভের পর রানী ভিক্টোরিয়া’র প্রথম হুকুম ছিল “এক ঘণ্টা একা থাকতে দাও” – এই সারাদিনের দুর্বিসহ ঘেরাটোপ থেকে এক ঘন্টার মুক্তি।

অল্প বয়সী রানী’র তৎকালীন পরামর্শদাতা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মেলবন। ১৮৩৭ সালে একটা গুজব্ উঠেছিল তাঁদের বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতা দেখে সবাই ভেবেছিলেন্ মেলবন কে বিয়ে করে উইলসন্ ক্যাসেলে একসঙ্গে সময় কাটাছিলেন রানী। তিনি এই সম্পর্কে’র নাম দিয়েছিলেন শুধুই বন্ধুত্ব। রানী তাঁর ব্যাক্তিগত ডায়েরিতে লিখেছিলেন মেলবন সৎ, বিশাল মনের অধিকারী একজন মনের মানুষ। রানী’র শপথ গ্রহণের দু’বছর পর ১৯৩৯ সালে তাঁর ১৭ তম জন্মদিনে জার্মান থেকে ইংল্যান্ডে বেড়াতে আসে তাঁর মামার ছেলে পিন্স্ আলবার্ট। তিনি ছিলেন সুদর্শন, উচ্চবংশ,সাহসী যোদ্ধা। সুন্দরী কুমারী রানীকে দেখে প্রেমে পড়ে যান। আলবার্ট’কে ভিক্টোরিয়াও বিয়ে করতে মুখিয়ে ছিলেন। তখন ব্রিটেনের রানী’কে প্রস্তাব দেওয়ার মতো স্পর্ধা ছিলনা তাঁর। সম্ভবত ব্রিটিশ এথিকস্ বা প্রথা ভেঙে রানী বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ১৮৪০ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। ১৮৪১ সালে তাঁদের প্রথম সন্তান ভিকি’র জন্ম হয়। এরপর মোট নয়টি সন্তান এর জন্ম দিয়েছিলেন তিনি।ইংল্যান্ডের একটা ছোট অংশ অ্যায়ারল্যান্ড সহ বেশকিছু অংশে এবং ভারতেও উপনিবেশিক্ আগ্রাসী শাসনের বিরুদ্ধে এই বিশাল অংশের শাসনভার হাতে নিয়েছিলেন। ১৮৬১ সালে টাইফ্রয়েড্ জ্বরে মারা যান তাঁর স্বামী পিন্স্ আলবার্ট রানী এতে অনেকটা মুঁছড়ে যায়। ১৮৬৮ সালে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম গ্ল্যাডি স্টোনের সঙ্গে উত্তেজনা চরমে ওঠে। সরকার কি করতে চাইছেন ? । ক্রিমিয়ার যুদ্ধে শীত থেকে বাঁচাতে নানা জিনিস্ সামগ্রী এবং যুদ্ধের উপকরণ সৈন্যদের তিনি পাঠাতেন। ।তিনি আর কেও নয় ইংল্যান্ড রাজপরিবারের তত্যন্তচর্চিত নাম রানী ভিক্টোরিয়া।